Saturday, September 10, 2016

আনবাড়ি

কিছু কিছু মানুষের রূপকথা নিয়ে অবসেশন সম্ভবতঃ সারা জীবন থেকে যায়। ছোটবেলায় বিশ্বকোষ পড়তুম আর চোখের সামনে দৃশ্যেরা ভেসে বেড়াতো। আমি যদি কোথাও ভ্রমণে যেতে চেয়ে থাকি সে কেবল আমার রূপকথাস্মৃতিনির্ভরতার জন্যে। বইয়ের সঙ্গে, গল্পের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে পাবার আশায়।

মা-বাবা আমাদের বড়ো করতে চেয়েছিলেন স্পার্টান লাইফ স্টাইলে। যাতে ন্যূনতম প্রয়োজন ও ন্যূনতম উপকরণে আমরা বেঁচে থাকতে পারি। পুরো যে সফল হতে পারেননি, সেটা কতটা আমাদের ত্রুটি তা অবশ্য জানিনে। আমাদের কিন্তু কোন খেদ ছিল না সেই জীবন নিয়ে। শিশুরা জাগতিক দেনাপাওনা সম্পর্কে অজ্ঞ থাকে বিধায় বড় সুখে থাকতে পারে। সুতরাং আমরা বড় হচ্ছিলুম কঠোর বুদ্ধিজীবি সুলভ ডিসিপ্লিন, বইয়ের রাশি আর অজস্র হাসিখুশি আর কল্পনার মধ্যে। মা-বাবার ব্যর্থতার সম্ভবতঃ কারণ ছিল কল্পনার আবর্জনা আমাদের মাথায় রেখে দেওয়া।  

পুজোয় একটা মাত্র জামা হতো।মুখ বুজে নিতে হতো সবচেয়ে অপছন্দের জামাটাই । খাবারে দাবারে বিলাসিতা তো দূরের কথা , সামান্য প্রয়োজনও মেটাও কঠিন। আসলে বাবার সামান্য মাইনেতেও সংসারে লোকের অভাব ছিল না।  বাবার অনাথ ছাত্ররা, বিপন্ন স্বজন এবং বেড়াতে আসা আত্মীয়েরা, পুরনো কমরেডরা। সুতরাং আমি দিব্যি মনে করতে পারি রাত্তিরবেলা মা আমাকে গরম ভাতে নুন মেখে খাওয়াচ্ছেন নিমতলার মাঠ থেকে জগঝম্পের ঝনঝন্‌ , ফুলুটের প্যাঁ প্যাঁ ভেসে আসছে। মা আমাকে খাওয়াতে খাওয়াতে বলছেন -“শীগগির খেয়ে নাও সোনা, আমরা তারপর নাটক দেখতে যাবো তো”।

সেবার নাটক হয়েছিলো শ্রীকান্ত। পিসেমশাই তো ছিনাথ বহুরূপীর লেজ কেটে নিলেন। আর কাটা লেজটা আমাদের ঘরে বহুদিন শোভা হয়ে ছিলো। মাঝে মাঝে লেজটা পরে দেখতুম আমি। ওই বাড়িটাতেই আমার প্রথম লক্ষ্মী পেঁচা দেখা। দিদিভাই ইস্কুল থেকে নিয়ে এসেছিল অপরাজিতার বীজ। তারাই কালে কালে পেঁপে গাছের নীচে  জঙ্গল হয়ে গ্যালো। সারাদিন সেখানে পাতলা কাগজের মতো হলুদ আর সাদা প্রজাপতি উড়ত। আর আমাদের কুড়িয়ে পাওয়া বিড়ালছানা সারাদুপুর প্রজাপতি ধরার জন্যে খেলে বেড়াতো ওখানে। বেড়ালটার নাম দিয়েছিলুম তুপা। সেও আমাদের রাশিয়ান ছবির বই থেকে নেওয়া নাম। তারপর একদিন ওইখানে সন্ধ্যেবেলায় নিস্তব্ধ নরম ডানা মেলে পেঁচাটা নামলো।

তারপর বড় হয়ে যতবার পড়ি “বুঝেছি শীতের রাত, অপরূপ,মাঠে মাঠে ডানা ভাসাবার গভীর আহ্লাদে ভরা” , আমার সেই সাদা পেঁচার রাজকীয় উড়ানের কথা মনে পড়ে যায়।
ওই বাড়ির উঠোনটায় মা আমাদের ছুঁচোদের রেলগাড়ি দেখিয়েছিলেন। মা ছুঁচোর লেজ কামড়ে একগাদা ছানা ছুঁচোর দল।সুযোগ পেলে এখনো সাদা কাগজে আমি ওই রেলগাড়িটা আঁকি। মেয়েকেও এঁকে দিই।

শিলিগুড়ি থেকে বাবুমামা এলে আমাকে কোলে করে গেটের কাছে বেড়াতে নিয়ে যেত আর ডুয়ার্সের কুনকি হাতী ফুলমোতির গল্প বলতো।
সেই বাড়িটায় বিকেল হলেই আমরা হারমোনিয়াম নিয়ে গান করতে বসতুম। গীতবিতানের মাত্র প্রেম আর প্রকৃতি পর্যায়ের গানগুলোর বইটাই ছিল সম্বল। ঝুলনের দিন বাবার ছাত্ররা দেবদারু আর ফুল্ল কদমের ডাল এনে দিলে  ধান শুকোবার টিনের ডালায় মা আমাদের ঝুলন করে দিতেন। কাঠের গুঁড়োর রাস্তা। আয়নার টলটলে পুকুর। পেপারব্যাক ইংরিজি নভেলের পাহাড়। মাটির বাড়ি। উল্টো ঝোলানো চৌকির দোলনায় মাটির কেষ্ট ঠাকুর। ডালে ডালে পেলাস্টিকের রঙিন পাখি।জন্তু জানোয়ার। কালো কচ্ছপ। সন্ধ্যেবেলায় আমরা খুব উৎসাহ করে গান করতুম “ঝুলন দোলায়,মাটির খেলায় এলো রে রাখাল রাজা”। দিদিভাইকে দেওয়া রাজকাহিনী খুলে পড়া হতো বাপ্পাদিত্যের ঝুলন রাতের বর্ণনা। আমরা তাই শিশুকালে বড় সংস্কারমুক্ত ছিলাম । কেষ্ট ঠাকুর ঝুলনের অর্নামেন্ট হয়েই থাকতেন। লুচি পায়েসের উপলক্ষ্য হতেন না।

এই রকম একটা হাসিখুশি ভরা বাড়িতে ছিল আমার ছেলেবেলা। সেই বাড়িটার একসন্ধ্যেয় আমরা গামলায় মুড়ি রসুন লঙ্কা মেখে খাচ্ছিলুম। হাসছিলুম হোহো করে। হারমোনিয়াম নিয়ে গানও হচ্ছিলো খুব। সদ্য বিবাহিতা ছোট মাসি-মেসো, মনিমামা, মা আমি দিদিভাই পিসি ছোট্ট রিতি।
এমন সময় এক জাপানি মহিলা মিচিকো ইসানো তাঁর পালিত পুত্রকে নিয়ে বজ্রপাত সম প্রবেশ করলেন।  আমাদের কোন জাপানিজ কানেকশন ছিলনা। জানা গেলো পালিত পুত্রটি বাবার ভূতপুর্ব ছাত্র। মা কে তিনি দেখাতে এনেছেন কোন বাড়িতে তিনি খিদের দিনে ভাত পেয়েছেন, সঙ্গে অঢেল স্নেহ।
চাদরের ছেঁড়ার উপর উল্টো করে বসিয়ে দেওয়া হল শেষ হওয়া মুড়ির গামলা। ঘরদোরের অপ্রস্তুত অবস্থা ঢাকতে  আর কি কি হয়েছিলো মনে নেই। তবে আমরা যে একগাদা গান গেয়েছিলুম ,মণিমামা তবলা বাজিয়েছিল সেকথা দিব্যি মনে আছে। মিচিকো ইসানো গাদা গাদা পেন্সিল,রবার,লাফদড়ি,নোটবুক,রংপেন্সিল, রুমাল, চকোলেট, ক্ষুদে  ক্ষুদে গাড়ি,খেলনা ইত্যাদি উপহার দিয়ে গেলেন। মিচিকো ইসানোর কষ্ট করে লেখা চিঠিগুলোর উপরকার স্ট্যাম্প কেটলির ভাপ দিয়ে আমি আর দিদিভাই তুলে নিয়ে আমাদের স্ট্যাম্প কালেকশনে রাখলুম।

ব্যস, আমার বিশ্বকোষপ্রসূত জাপান বিষয়ক জ্ঞান ঘুচে গেলো। জাপানকে আমি মনে রাখলুম অন্যভাবে। বরফঢাকা ফুজিয়ামার পাশে সাকুরা নয়, খোঁচা খোঁচা দাঁড়িয়ে থাকলো লালনীল পেন্সিল। আর মনে থাকলো সাকুরা ঢেকে দেওয়া পুরুষ্টু কালো-সোনালি মৌমাছির ছবি।

কালকে হঠাৎ একটা গান মনে পড়লো। “ ভবসা –গরকা-রণতা-রণহে/ গুরুদে-বোদয়া-করদী-নজনে”। এই গানটাও আমরা মিচিকো দিদিমণিকে শুনিয়েছিলুম নানারকম গণসংগীত আর রবিবাবুর গানের সাথে। এই গানের সঙ্গে সঙ্গে আমার এতো শত পুরনো স্মৃতি মনে পড়ে গেলো। আনন্দময় ছেলেবেলার স্মৃতির বাড়ি। যেসব হাসিখুশি ফেলে এসেছি বহুকাল।

কোন নক্ষত্রের সুতো যে কোন গাছের শিকড়ের কোথায় বাঁধা থাকে.........

No comments:

Post a Comment