Thursday, September 29, 2016

খুঁজে পাওয়া বই রাত জাগা চোখ

আমার বরাবর মনে হয় আমি পুরোনো পৃথিবীর মানুষ। আর পুরনো বললেই কেন জানি না চারপাশ আর বেশী দূষণ মুক্ত হবার বিভ্রম ঘটে। মনে হয় পৃথিবীটাকে যেভাবে আমরা দেখছিলাম সেভাবে আর কেউ কখনো দেখতে পাবে না। সেই সময়টা একটা টলটলে মুক্তো হয়ে অনামিকায় রয়ে গ্যাছে।কিন্তু তার সব রেখা বা রশ্মি মুখস্থ হয়নি অথবা শেষ হওয়া সেন্টের শিশি জমিয়ে রাখতাম যেমন। বহুদিন বহুদিন পরে হাল্কা গন্ধ পাওয়া যেত শিশি খুললেই। অথবা হারিয়ে যাবে, তাই বা বলি কেন? অ্যান্ড্রোমিডা নক্ষত্রপুঞ্জ থেকে কেউ যদি দ্যাখে আড়াই কোটি বছর পর আমাদের সময়টা সে ঠিক দেখতে পাবে।

আমার দিব্যি মনে আছে দুহাজার পাঁচের সেই বিকেলটা,যেদিন কলেজের পাশেরই একটা সাইবার ক্যাফে থেকে অর্কুটের প্রথম প্রোফাইল খুলেছিলাম। বাইরে সম্ভবতঃ শেষ বসন্তের বিকেল হু হু করছিল। সেদিন তারপর আর কি কি হয়েছিলো স্পষ্ট মনে আছে। খুব বেশী দিন তো নয়, নয় বছর মানে তো মাত্র  ন'বার সূর্য প্রদক্ষিণ করেছে পৃথিবী।

আমাদের মফস্বলী পাড়া গুলোর সঙ্গে বড্ড মিল ছিল অর্কুটের। দিনে একবার পড়শীর জানলায় উঁকি দেয়া। ছাদ থেকে ছাদে আচারের বাটি চালাচালির মত স্ক্র্যাপ বিনিময়। ছোট ছোট নিরুদ্বেগ রকের মত আমাদের কমিউনিটি গুলো। পোস্ট করা , মুখ দেখাদেখি বন্ধ মানে ব্লক করে দেওয়া, জি টি মানে গেট টুগেদার, এইসব আস্তে আস্তে তখন আমাদের ডায়াস্পোরিক ভোকাবুলারি হয়ে যাচ্ছে। যত স্বচ্ছন্দে আমরা পাড়ায় আড্ডা দিতাম তত স্বচ্ছন্দেই খেলে বেড়িয়েছি অর্কুটে। যেখানে মানে যে জীবনে আমরা সকলেই অল্মোস্ট পার্ফেক্ট ছিলাম, এবং খুব সুচারু আর শালীন ভাবে বেআব্রু ও ছিলাম।

কাল রাতে বহুদিন পরে অর্কুট খুলে খুব হিসেব করতে ইচ্ছে করেছে আমাদের সোশ্যাল নেটোয়ার্কিং এ প্রথম হাতে-খড়ির অর্কুট আমাকে অন্ততঃ কি কি দিয়েছে। আমাকে গান দিয়েছে অর্কুট। সুমন দা ধরে ধরে গান শুনাতো। সুসান ভেগা , লিওনার্দো কোহেন , বব ডিলান , উইলি নেলসন। দীর্ঘ রোগ ভোগের পরে শুশ্রূষার মত সেই গান আমায় কত আশ্রয় দিয়েছিল সে তো আজ বুঝেছি। বইমেলায় দেখা করা কবিতা কম্যুনিটির বন্ধুরা। অং বং চং এর পিকনিক। শুদ্ধদার বাড়িতে খাওয়া দাওয়া। আমাদের কুট সাহিত্য। আহা, আমাদের ছোট কবিতার কাগজের প্রকাশ অনুষ্ঠান। ফটোগ্রাফি আর পেইন্টিং এর পার্থক্য শেখানো অর্কুট।এর মধ্যে খিল্লি শব্দটাও উঠে এলো আমাদের জিভে।

সাব্লাইম এক রকম প্রেম । যা নিয়ে নিজের ভিতরে নিজে কতদিন বুঁদ হয়ে থেকেছি নেশাড়ুর মত। সেই প্রেম লিখতে শেখালো। খরধার রসনায় অন্যের লেখা ছিঁড়তে বাঁধা দিলো। একা থাকার দিনগুলোয়  একাকীত্ব আড়াল করে দাঁড়ালো অর্কুট।

অজস্র সম্পর্ক দিলো অর্কুট। যাদের আজকাল খুব স্বাভাবিক আত্মীয়তা বলে মনে হয়।খুব দরকারে নির্ভর করতে পারি।রাজা দা আজ বলছিলেন সেরকম বন্ধুত্ব আজ আর হয় না। আমিও মানি এই ফেসবুক যেন কসমোপলিটান  ফ্ল্যাটবাড়িগুলোর মত। মুখ চেনাচিনি আছে, দেঁতো হাসি আছে কিন্তু আত্মাটুকু নেই। যা ছিল আমাদের অর্কুটে।

  

বহুদিন যাইনি ওখানে। ভাবতাম ওটা তো থাকবেই আমাদের প্রাগৈতিহাসিক ভালোবাসাবাসি, বন্ধুত্ব, শত্রুতা নিয়ে। কখনো মনে হয়নি এভাবেই একদিন ডুবন্ত জাহাজ হয়ে যেতে পারে আমাদের সেই কাল। যেন আমাদের পায়ের ছাপ ফেলে আসা ইস্কুলের করিডোর।ছেড়ে আসার পর যাওয়া হয়নি আর , কিন্তু আমাদের হাতের লেখা দেওয়ালে রয়ে গ্যাছে। কেউ নেই, আসাযাওয়ার অভিজ্ঞান রয়ে গ্যাছে শুধু। ঠিক যেভাবে আর দেখা হয়নি "মোর বীণা ওঠে কোন সুরে বাজি" র সঙ্গে সমে ধা ফেলে পারমিতার নাচ, সোহিনীর গান। লাইব্রেরীর বইদের। বা যেমন মনে হয়েছিলো প্রথম প্রেম ভেঙে যাবার পর, সেই দুবছরের ভালোবাসা সত্যি হয়ে থাকবে আজীবন।

"আজীবন" শব্দটা বড্ড বড়। কালকে মেইলবক্সে আসা মেইলে অর্কুট কর্তৃপক্ষ লিখেছেন অনিবার্য কারণ বশতঃ তারা অর্কুট বন্ধ করে দিচ্ছেন।অন্য নেটোয়ার্কিং সাইটে যেন আমরা ফুলে ফলে ভরে উঠি। এই শেষ বেলায় আমার দেওয়ালে পুরোনো চিরকুটের ছড়াছড়ি। কত ভালোবাসা, রাগ,দুঃখ... এরা আমাকে ছেড়ে চলে যাবে।বাসা বদলের আগে বড্ড দেখতে ইচ্ছে করছিল পুরনো সেই হাল্কা নীল ব্যাকগ্রাউন্ড। পুরনো সব প্রোফাইল পিকচার। বন্ধুর তোলা ছবিতে লেখা "আর চাঁদ তখন মরে যাচ্ছিলো একটা সম্পর্কের জন্যে"...

সত্যি তো, এ ভালোবাসায় আমার আর কি অধিকার? আমি তো এদের কোনো খবরই রাখিনি... একদিনও ফিরে এসে বলা হয় নি-

"চুলের কাঁটার বাঁকে বাঁকে
লেখা আছে গতিনির্দেশ
পাইনের স্কার্টের ঘেরে লেগে আছে কালকের শীত

জ্বরের নরম গন্ধ, বন্ধুর গাড়ির ব্যাকসীট...

কুয়াশায় মুছে গেছে অর্ধেক গ্রাম
হেডলাইটের ধার মিশছে নরম অন্ত্যমিলে

অতীত, কেমন আছ?
এতদিন কীরকম ছিলে?"
               
( উপরের কবিতাটি ব্যবহার করতে দিয়ে ঋণী করলেন আশিক খুদাবখ্‌স । ইনিও যথারীতি অর্কুটে পাওয়া বন্ধু।) #bidayorkut

Saturday, September 10, 2016

আনবাড়ি

কিছু কিছু মানুষের রূপকথা নিয়ে অবসেশন সম্ভবতঃ সারা জীবন থেকে যায়। ছোটবেলায় বিশ্বকোষ পড়তুম আর চোখের সামনে দৃশ্যেরা ভেসে বেড়াতো। আমি যদি কোথাও ভ্রমণে যেতে চেয়ে থাকি সে কেবল আমার রূপকথাস্মৃতিনির্ভরতার জন্যে। বইয়ের সঙ্গে, গল্পের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে পাবার আশায়।

মা-বাবা আমাদের বড়ো করতে চেয়েছিলেন স্পার্টান লাইফ স্টাইলে। যাতে ন্যূনতম প্রয়োজন ও ন্যূনতম উপকরণে আমরা বেঁচে থাকতে পারি। পুরো যে সফল হতে পারেননি, সেটা কতটা আমাদের ত্রুটি তা অবশ্য জানিনে। আমাদের কিন্তু কোন খেদ ছিল না সেই জীবন নিয়ে। শিশুরা জাগতিক দেনাপাওনা সম্পর্কে অজ্ঞ থাকে বিধায় বড় সুখে থাকতে পারে। সুতরাং আমরা বড় হচ্ছিলুম কঠোর বুদ্ধিজীবি সুলভ ডিসিপ্লিন, বইয়ের রাশি আর অজস্র হাসিখুশি আর কল্পনার মধ্যে। মা-বাবার ব্যর্থতার সম্ভবতঃ কারণ ছিল কল্পনার আবর্জনা আমাদের মাথায় রেখে দেওয়া।  

পুজোয় একটা মাত্র জামা হতো।মুখ বুজে নিতে হতো সবচেয়ে অপছন্দের জামাটাই । খাবারে দাবারে বিলাসিতা তো দূরের কথা , সামান্য প্রয়োজনও মেটাও কঠিন। আসলে বাবার সামান্য মাইনেতেও সংসারে লোকের অভাব ছিল না।  বাবার অনাথ ছাত্ররা, বিপন্ন স্বজন এবং বেড়াতে আসা আত্মীয়েরা, পুরনো কমরেডরা। সুতরাং আমি দিব্যি মনে করতে পারি রাত্তিরবেলা মা আমাকে গরম ভাতে নুন মেখে খাওয়াচ্ছেন নিমতলার মাঠ থেকে জগঝম্পের ঝনঝন্‌ , ফুলুটের প্যাঁ প্যাঁ ভেসে আসছে। মা আমাকে খাওয়াতে খাওয়াতে বলছেন -“শীগগির খেয়ে নাও সোনা, আমরা তারপর নাটক দেখতে যাবো তো”।

সেবার নাটক হয়েছিলো শ্রীকান্ত। পিসেমশাই তো ছিনাথ বহুরূপীর লেজ কেটে নিলেন। আর কাটা লেজটা আমাদের ঘরে বহুদিন শোভা হয়ে ছিলো। মাঝে মাঝে লেজটা পরে দেখতুম আমি। ওই বাড়িটাতেই আমার প্রথম লক্ষ্মী পেঁচা দেখা। দিদিভাই ইস্কুল থেকে নিয়ে এসেছিল অপরাজিতার বীজ। তারাই কালে কালে পেঁপে গাছের নীচে  জঙ্গল হয়ে গ্যালো। সারাদিন সেখানে পাতলা কাগজের মতো হলুদ আর সাদা প্রজাপতি উড়ত। আর আমাদের কুড়িয়ে পাওয়া বিড়ালছানা সারাদুপুর প্রজাপতি ধরার জন্যে খেলে বেড়াতো ওখানে। বেড়ালটার নাম দিয়েছিলুম তুপা। সেও আমাদের রাশিয়ান ছবির বই থেকে নেওয়া নাম। তারপর একদিন ওইখানে সন্ধ্যেবেলায় নিস্তব্ধ নরম ডানা মেলে পেঁচাটা নামলো।

তারপর বড় হয়ে যতবার পড়ি “বুঝেছি শীতের রাত, অপরূপ,মাঠে মাঠে ডানা ভাসাবার গভীর আহ্লাদে ভরা” , আমার সেই সাদা পেঁচার রাজকীয় উড়ানের কথা মনে পড়ে যায়।
ওই বাড়ির উঠোনটায় মা আমাদের ছুঁচোদের রেলগাড়ি দেখিয়েছিলেন। মা ছুঁচোর লেজ কামড়ে একগাদা ছানা ছুঁচোর দল।সুযোগ পেলে এখনো সাদা কাগজে আমি ওই রেলগাড়িটা আঁকি। মেয়েকেও এঁকে দিই।

শিলিগুড়ি থেকে বাবুমামা এলে আমাকে কোলে করে গেটের কাছে বেড়াতে নিয়ে যেত আর ডুয়ার্সের কুনকি হাতী ফুলমোতির গল্প বলতো।
সেই বাড়িটায় বিকেল হলেই আমরা হারমোনিয়াম নিয়ে গান করতে বসতুম। গীতবিতানের মাত্র প্রেম আর প্রকৃতি পর্যায়ের গানগুলোর বইটাই ছিল সম্বল। ঝুলনের দিন বাবার ছাত্ররা দেবদারু আর ফুল্ল কদমের ডাল এনে দিলে  ধান শুকোবার টিনের ডালায় মা আমাদের ঝুলন করে দিতেন। কাঠের গুঁড়োর রাস্তা। আয়নার টলটলে পুকুর। পেপারব্যাক ইংরিজি নভেলের পাহাড়। মাটির বাড়ি। উল্টো ঝোলানো চৌকির দোলনায় মাটির কেষ্ট ঠাকুর। ডালে ডালে পেলাস্টিকের রঙিন পাখি।জন্তু জানোয়ার। কালো কচ্ছপ। সন্ধ্যেবেলায় আমরা খুব উৎসাহ করে গান করতুম “ঝুলন দোলায়,মাটির খেলায় এলো রে রাখাল রাজা”। দিদিভাইকে দেওয়া রাজকাহিনী খুলে পড়া হতো বাপ্পাদিত্যের ঝুলন রাতের বর্ণনা। আমরা তাই শিশুকালে বড় সংস্কারমুক্ত ছিলাম । কেষ্ট ঠাকুর ঝুলনের অর্নামেন্ট হয়েই থাকতেন। লুচি পায়েসের উপলক্ষ্য হতেন না।

এই রকম একটা হাসিখুশি ভরা বাড়িতে ছিল আমার ছেলেবেলা। সেই বাড়িটার একসন্ধ্যেয় আমরা গামলায় মুড়ি রসুন লঙ্কা মেখে খাচ্ছিলুম। হাসছিলুম হোহো করে। হারমোনিয়াম নিয়ে গানও হচ্ছিলো খুব। সদ্য বিবাহিতা ছোট মাসি-মেসো, মনিমামা, মা আমি দিদিভাই পিসি ছোট্ট রিতি।
এমন সময় এক জাপানি মহিলা মিচিকো ইসানো তাঁর পালিত পুত্রকে নিয়ে বজ্রপাত সম প্রবেশ করলেন।  আমাদের কোন জাপানিজ কানেকশন ছিলনা। জানা গেলো পালিত পুত্রটি বাবার ভূতপুর্ব ছাত্র। মা কে তিনি দেখাতে এনেছেন কোন বাড়িতে তিনি খিদের দিনে ভাত পেয়েছেন, সঙ্গে অঢেল স্নেহ।
চাদরের ছেঁড়ার উপর উল্টো করে বসিয়ে দেওয়া হল শেষ হওয়া মুড়ির গামলা। ঘরদোরের অপ্রস্তুত অবস্থা ঢাকতে  আর কি কি হয়েছিলো মনে নেই। তবে আমরা যে একগাদা গান গেয়েছিলুম ,মণিমামা তবলা বাজিয়েছিল সেকথা দিব্যি মনে আছে। মিচিকো ইসানো গাদা গাদা পেন্সিল,রবার,লাফদড়ি,নোটবুক,রংপেন্সিল, রুমাল, চকোলেট, ক্ষুদে  ক্ষুদে গাড়ি,খেলনা ইত্যাদি উপহার দিয়ে গেলেন। মিচিকো ইসানোর কষ্ট করে লেখা চিঠিগুলোর উপরকার স্ট্যাম্প কেটলির ভাপ দিয়ে আমি আর দিদিভাই তুলে নিয়ে আমাদের স্ট্যাম্প কালেকশনে রাখলুম।

ব্যস, আমার বিশ্বকোষপ্রসূত জাপান বিষয়ক জ্ঞান ঘুচে গেলো। জাপানকে আমি মনে রাখলুম অন্যভাবে। বরফঢাকা ফুজিয়ামার পাশে সাকুরা নয়, খোঁচা খোঁচা দাঁড়িয়ে থাকলো লালনীল পেন্সিল। আর মনে থাকলো সাকুরা ঢেকে দেওয়া পুরুষ্টু কালো-সোনালি মৌমাছির ছবি।

কালকে হঠাৎ একটা গান মনে পড়লো। “ ভবসা –গরকা-রণতা-রণহে/ গুরুদে-বোদয়া-করদী-নজনে”। এই গানটাও আমরা মিচিকো দিদিমণিকে শুনিয়েছিলুম নানারকম গণসংগীত আর রবিবাবুর গানের সাথে। এই গানের সঙ্গে সঙ্গে আমার এতো শত পুরনো স্মৃতি মনে পড়ে গেলো। আনন্দময় ছেলেবেলার স্মৃতির বাড়ি। যেসব হাসিখুশি ফেলে এসেছি বহুকাল।

কোন নক্ষত্রের সুতো যে কোন গাছের শিকড়ের কোথায় বাঁধা থাকে.........

Saturday, August 2, 2014

আপ.কো হামারি কসম লওট আইয়ে

আসলে এ শহর হল বেবাক রাংতা-মোড়া এক উলিঝুলি পাগল।নিছক পাগল কি নিছক শহর নয় হে,এ এক বেশুমার রঙ্গ।সেদিন অনেক হেঁটেছি চৌরঙ্গী,পার্ক স্ট্রীট এ।অবশেষে সন্ধ্যে এল।নিউ মার্কেট এর উলটো দিকে তখন ভীষণ সবুজ ময়দান,রাস্তায় শান্‌দার ভিড়... আর আকাশে হয়তো মেঘ ছিল...

আমি নিস্পৃহ মাতালের মত বৃষ্টি খুঁজেছি আজ,তারপর ক্লান্ত গলির মোড়ে ফিরে এসেছি অনিবার্য্যতায়.. এতো তুমি জানোই,কত বছরের হাওয়ায় হাওয়ায় আমি খুঁজে ফিরেছি তোমার উপত্যকা......তোমার কফি-কাপ এ লেগে থাকা তোমার ঠোঁটের উষ্ণতা...তোমার অন্ধকার নিবিড়তম...বহু বহু দিনের পিছন থেকে সেই সব গলে যাওয়া সময়ের হাড়-মজ্জা ছুঁয়ে দিল আমার সোনাঝুরি বন...

এসব অহেতুক মূর্চ্ছনা সমূহে বিভ্রম ঢেকে দেয় আমার...সোডিয়াম ভেপারের হলুদ আলোয় তোমার দীর্ঘদেহী ছায়া সিগারেট ধরিয়ে বাঁক ঘোরে...আমিও বৈধ চিনির স্বাদ জিভে নিয়ে পাশ ফিরি ঘুমের একান্তে...
 — at আপ কো হামারি কসম লওট আইয়ে...... 

শীত বলেছে যাবো যাবো

December 18,2013


আমাদের মফঃস্বলে এখন প্রগাঢ় শীত। দীঘির ধারে ভাঙা নীলকুঠিতে মিলিয়ে যায় রোদ।ধুলোয় লুটোপুটি খাওয়া কুকুরছানারা এবার খুঁজে নেবে সান্ধ্য আশ্রয়।

যে পথ দিয়ে রোজ আমি ঘরে ফিরি, সে পথের ধুলোয় ধুলোয় লেগে থাকে উষ্ণতার জন্যে অভিমান।বাড়ি ফিরে ধোঁয়ার মেঘ জমা কফি-কাপ হাতে বারান্দায় দাঁড়াই । বিল্টুদাদের পাঁচিলে একটা বিষণ্ণ দোয়েল , এই সন্ধ্যের মত সাদা-কালো রঙের লেজ নাচিয়ে শিস দেয়। হুহু করে বয়ে যাওয়া নিশ্চুপ হাওয়ারা কত সব গল্প বলে।

যে সব গল্পে আমাদের প্রান্তিক মিষ্টান্ন ভান্ডারের সামনে লাল সাইকেলগুলো অপেক্ষা করে আছে অনন্তকাল। জলকন্যারা ফিরে যাচ্ছে স্কুলের পোশাকে । জানলার বাইরে পাহারা দেয় চাঁদের শিল্যুয়েট ।

যে দিন আর কখনো ফিরবে না তার জন্যে এ দুঃখ। পানশালায় গিটার বেজে ওঠে। ম্যায়ফিঁল ম্যায়ফিঁল অ্যাঁয় শমা। যে গলি পর্যন্ত তোমার লোভ আমাকে তাড়িয়ে এনেছে, তা থেকে ফিরবার পথ আর নেই। নিয়ত মেমননের সমাধি ঘিরে পাখিদের উড়ান সাঙ্গ হয়।
হে বিষাদ , হে শীতের দিন, এভাবে একা ফেলে চলে যেও না।
 — at আপ কো হামারি কসম লওট আইয়ে...

স্মৃতিবিথার

December 13, 2013


মাঝে মাঝে কি সব অদ্ভুত স্মৃতি ফিরে ফিরে আসে। আজ সন্ধ্যের বাসে বাড়ি ফিরে আসছিলাম। ফাঁকা বাস, ফাঁকা রাস্তা । খোলা রাস্তায় বয়ে যাচ্ছে হু হু হাওয়া। এয়ারপোর্টের লাইটগুলো জ্বলছিল, নিভছিল। আর কি অসাধারণ বাস, পুরনো হিন্দি সিনেমার গান বাজাচ্ছিল মৃদু স্বরে।
হঠাৎ একটা গান বাজতে শুরু করল " চল , চল , মেরে হাতি , ও মেরে সাথি,...... চল ইয়ার ,ধাক্কা মার"।

এই একটা গান আমাকে সেই কোন ছোটোবেলায় টেনে নিয়ে গেলো। আমাদের সেই ছোটবেলায় সাকুল্যে দুটো টিভি চ্যানেল ছিল। শনিবার করে সন্ধ্যে বেলায় হিন্দি সিনেমা হতো । আর তার পূর্বাভাস পাওয়া যেত সেদিনের খবরের কাগজে।

আমি তখন শুভো দাদার কাছে আঁকা শিখতাম, ইস্কুলেও যাই না। আর বাবার কাছে শুভো দাদা বাংলা পড়তো। উচ্চ-মাধ্যমিকের বাংলা। শুভোদাদার হরেক রকম গল্পের বই ছিল। শুভো দাদা তেল রঙে নানারকম ছবি আঁকত। সেই লোভে লোভে আমিও বাবার সঙ্গে যেতাম।

শনিবার করে শুভো দাদা আসতো আমাদের বাড়ী। আমায় আঁকা শেখাতে। রোজ খানিকটা আঁকার পরে আমাকে "সিনারি" আঁকতে দিতেই হতো। সন্ধ্যের সিনারি। তাতে সুজ্জি ডুবে যেতো, পাখিরা ঘরে ফিরত, বুড়ো বট গাছের কোটোরে উঁকি দিত পেঁচা আর পেঁচার ছানা।আর তরমুজের খেতে গোটা সংসার নিয়ে নেমে আসতো খরগোশেরা।

এরম এক শনিবার বাড়িতে মা ছিলেন না, আর কাগজে দিয়েছিলো সেই সন্ধ্যায় "হাতি মেরে সাথি" সিনেমা টা আছে। সারা সন্ধ্যে আমরা খুব সাহস করে টিভি খুলে অপেক্ষা করেছিলাম ।( কারণ তখন হিন্দি সিনেমা দেখা ইন্ডিয়ান পেনাল কোডে অপরাধপ্রতিম ছিল)।

কিন্তু সেদিন কেন কে জানে সিনেমাটা দেয়নি টিভিতে। বহুদিন আকুলতা নিয়ে অপেক্ষা করেছিলাম সিনেমাটা দেখার জন্যে। যখন দেখেছিলাম বড্ড বোকা বোকা লেগেছিল । আমি অনেকদিন আর ছবি আঁকি না। শুভোদাদার কাছে আঁকা শেখার কথাও ভুলেই গেছিলাম। মনে পড়লো কালো আর্টপেপারে সাদা রঙে অসম্ভব সুন্দর একটা মেয়ের পোর্ট্রেট এঁকেছিল শুভোদাদা। তারপর আঁকা ছেড়ে দিয়ে ব্যাঙ্গালোরে ফিজিওথেরাপি পড়তে চলে গেছিলো।

এখন শুভোদাদার মস্ত চেম্বার। আজকে সন্ধ্যেয় হঠাৎ ইচ্ছে করল জানতে , রঙ দিয়ে ম্যাজিক দেখানো শুভোদাদা অবনীন্দ্রনাথ , গগনেন্দ্রনাথের ছবি আঁকার গল্প গুলো ভুলে গ্যাছে কিনা...

আমাদের কত সব খুচরো চোদ্দ-আনা যে এভাবে পড়ে হারিয়ে যায়... কে তার হিসেব রাখে...
 — at এই হেমন্তের যত অশ্রুজল , আমি এবার নামিয়ে দেবো তোমার পায়...

কোজাগর

সব থেকে সুন্দর আর পরিষ্কার জোচ্ছনা হয় আশ্বিন মাসে। চরাচর ভাসানো জ্যোচ্ছনা।

আজ মায়ের সঙ্গে নেমন্তন্ন খেতে গেছিলাম,খেয়ে দেয়ে গলি-রাস্তা হেঁটে এলাম বাড়িতে।কোন রকমে চাঁদের আলো একটুখানি এসে পড়েছে গলির মধ্যে। দমদমের ঘরবাড়ি গুলো বড় নিষ্ঠুর, চাঁদকে আড়াল করে আকাশ ছুঁয়েছে।ছাতিম ফুলের গন্ধ পেতে গেলে যেতে হবে সেই কদমতলা ব্যাঙ্কের কাছে।

হাঁটতে হাঁটতে কত সব পুরনো কথা মনে পড়ল।আমাদের বারাসাতের বাড়িতে থাকতে প্রতি লক্ষ্মী পুজোতে পাপুদের বাড়িতে আমাদের নেমন্তন্ন হত। আমি , মা , পিসি, পাশের বাড়ির কাকিমা নেমন্তন্ন খেয়ে ফিরতাম। খিচুড়ী, লাবড়া , পায়েস, আলোচাল, কাটা ফলের গন্ধের সাথে মিশে থাকা ধুপ-ধুনো আর গাঁদা ফুলের গন্ধ আমাদের অনেকক্ষণ আসতো পিছু পিছু ।

হঠাৎ করে লোডশেডিং হয়ে গেলে দেখতাম লক্ষ্মীর পা আর ধানের ছড়ার পাশে লুটিয়ে আছে জ্যোচ্ছনা।বাধানো ইঁটের রাস্তা দিয়ে ফিরে আসতাম যখন , খালি মাঠের উপর ঘন হয়ে কুয়াশা নামতো, দুধের মত জোচ্ছনার ঢল, আর আমাদের ছাতিম গাছটা গন্ধ উজাড় করে দিত।

দূর থেকে ভেসে আসা উলু আর শঙ্খ ধ্বনি মনে হত যেন স্বপ্নের এক্সটেনশন। ছাদের পাশের নারকেলগাছের পাতা গুলো রুপোর মত ঝকঝক করত, ডানা ঝাপ্টে উড়ে এসে বসতো মস্ত বড় সাদা লক্ষ্মী পেঁচা।

আর আমি দিব্যি জানতাম , এই জ্যোচ্ছনা জমেই পরী হয়। আমি বাড়িতে নেই,কিন্তু কোজাগরীর আলোয় তৈরী হওয়া পরীটা নিশ্চয়ই খেলে বেড়াচ্ছে আমার প্রিয় ছাদটায়।
— playing কোজাগরী... at অলীক পেন্সিলে...

জুলাইয়ের রেনকোট

september 27, 2013

আজ কোটরা গেছিলাম।সকালে প্রচন্ড রোদ, ছিলো ভয়াবহ মন-খারাপ।দত্তপুকুর লোকালে মারামারি সঙ্গী করে নেমেছি খাঁ খাঁ প্ল্যাটফর্মে। তারপর লাল্টুদার গাড়ি চড়ে সোজা গন্তব্যে।

চোখ পুড়ে যাচ্ছিলো , মন ও অবশ । তিনটের সময় যখন বেরিয়েছি , দেখি আকাশে নীল মেঘ, তার উপর দিয়ে ধূসর রঙের তুলোর মত মেঘের ছানা। একটা অদ্ভুত হাওয়া দিচ্ছিলো। রাস্তায় পড়ে থাকা কাগজের টুকরো, শালপাতা, বিস্কুটের খালি প্যাকেট উড়েযাচ্ছিলো সেই হাওয়ায়। কুন্ডলি পাকিয়ে উড়ছিল রাস্তার ধারের ধুলোরা।

সামনেই একটা বন্ধ সাইকেলের দোকান।অল্প একটু বাঁধানো বসার জায়গা।দুটো ছোট্ট ছাগলছানা শিং বাঁধিয়ে লড়াই লড়াই খেলছে।

রাস্তায় পায়চারি করছিলাম।ছোট্ট ছোট্ট একদল স্কুলের ছেলে আমার পাশে দাঁড়িয়ে পড়ল। খুব উৎসাহী কণ্ঠে বলল, দেখ দেখ কেমন উড়ছে। আমিও আকাশে তাকিয়ে দেখি একঝাঁক শামখোল পাখি হাওয়ার বিপরীতে কেমন চক্র কেটে উড়ে যাচ্ছে, পিছিয়ে পড়া একেকটা পাখি প্রাণপণে ডানা আপসে উড়বার চেষ্টা করছে। চোখের বাইরে ওরা চলে যেতে একটা বাচ্চাকে ভারি ইর্‌রিলেভ্যান্ট প্রশ্ন করলাম...
-"আজ কত তারিখ রে?"
একটা ছেলে বলল -"২৭ শে সেপ্টেম্বর ,কাল ঈশ্বর চন্দ্র বিদ্যাসাগরের জন্মদিন ছিল না?"

গাড়ি এসে গেলে ফিরতে শুরু করলাম,তখনো বৃষ্টি নামেনি, ঘন হয়ে মেঘের ছায়া এসে পড়েছে পাম্প-হাউস, লাল শাকের খেত, বন বাদাড়, পথের পাশের পুকুরে।
ভিজে হাওয়ায় একটা অদ্ভুত সরসর শব্দ হচ্ছিলো ধানের খেতে, যেন কাঁচের কাজ করা গুজরাটি ঘাগরা পরে ছুটে আসছে কোনো সুন্দরী মেয়ে। দুধারে ধান খেত, গাড়ি থামিয়ে বেশ কিছুক্ষণ শুনলাম ধানক্ষেতের গান।

তারপর বেশ ভিজে বাড়ি ফিরেছি,আসার পথে স্টেশনে দেখে এলাম মামন আর ওর বন্ধুরা কামদুনি-পার্ক্সট্রীট-বরুন বিশ্বাস হত্যার প্রতিবাদে সভা করছে।রাস্তায় আবার একটা ইর্‌রিলেভ্যান্ট কথা মনে হল, যদি বৃষ্টি নামে, ওরা ভিজে যাবে, পথনাটিকা করতে পারবে না।

এখন মোটামুটি রাত।আর কিছু নয় ভগবান, আজ রাতে ঘুমটুকু অন্ততঃ দিও, যেন কোন ইর্‌রিলেভ্যান্ট কথা মনে না পড়ে।
 — at অলীকপেন্সিলে...