Thursday, September 29, 2016

খুঁজে পাওয়া বই রাত জাগা চোখ

আমার বরাবর মনে হয় আমি পুরোনো পৃথিবীর মানুষ। আর পুরনো বললেই কেন জানি না চারপাশ আর বেশী দূষণ মুক্ত হবার বিভ্রম ঘটে। মনে হয় পৃথিবীটাকে যেভাবে আমরা দেখছিলাম সেভাবে আর কেউ কখনো দেখতে পাবে না। সেই সময়টা একটা টলটলে মুক্তো হয়ে অনামিকায় রয়ে গ্যাছে।কিন্তু তার সব রেখা বা রশ্মি মুখস্থ হয়নি অথবা শেষ হওয়া সেন্টের শিশি জমিয়ে রাখতাম যেমন। বহুদিন বহুদিন পরে হাল্কা গন্ধ পাওয়া যেত শিশি খুললেই। অথবা হারিয়ে যাবে, তাই বা বলি কেন? অ্যান্ড্রোমিডা নক্ষত্রপুঞ্জ থেকে কেউ যদি দ্যাখে আড়াই কোটি বছর পর আমাদের সময়টা সে ঠিক দেখতে পাবে।

আমার দিব্যি মনে আছে দুহাজার পাঁচের সেই বিকেলটা,যেদিন কলেজের পাশেরই একটা সাইবার ক্যাফে থেকে অর্কুটের প্রথম প্রোফাইল খুলেছিলাম। বাইরে সম্ভবতঃ শেষ বসন্তের বিকেল হু হু করছিল। সেদিন তারপর আর কি কি হয়েছিলো স্পষ্ট মনে আছে। খুব বেশী দিন তো নয়, নয় বছর মানে তো মাত্র  ন'বার সূর্য প্রদক্ষিণ করেছে পৃথিবী।

আমাদের মফস্বলী পাড়া গুলোর সঙ্গে বড্ড মিল ছিল অর্কুটের। দিনে একবার পড়শীর জানলায় উঁকি দেয়া। ছাদ থেকে ছাদে আচারের বাটি চালাচালির মত স্ক্র্যাপ বিনিময়। ছোট ছোট নিরুদ্বেগ রকের মত আমাদের কমিউনিটি গুলো। পোস্ট করা , মুখ দেখাদেখি বন্ধ মানে ব্লক করে দেওয়া, জি টি মানে গেট টুগেদার, এইসব আস্তে আস্তে তখন আমাদের ডায়াস্পোরিক ভোকাবুলারি হয়ে যাচ্ছে। যত স্বচ্ছন্দে আমরা পাড়ায় আড্ডা দিতাম তত স্বচ্ছন্দেই খেলে বেড়িয়েছি অর্কুটে। যেখানে মানে যে জীবনে আমরা সকলেই অল্মোস্ট পার্ফেক্ট ছিলাম, এবং খুব সুচারু আর শালীন ভাবে বেআব্রু ও ছিলাম।

কাল রাতে বহুদিন পরে অর্কুট খুলে খুব হিসেব করতে ইচ্ছে করেছে আমাদের সোশ্যাল নেটোয়ার্কিং এ প্রথম হাতে-খড়ির অর্কুট আমাকে অন্ততঃ কি কি দিয়েছে। আমাকে গান দিয়েছে অর্কুট। সুমন দা ধরে ধরে গান শুনাতো। সুসান ভেগা , লিওনার্দো কোহেন , বব ডিলান , উইলি নেলসন। দীর্ঘ রোগ ভোগের পরে শুশ্রূষার মত সেই গান আমায় কত আশ্রয় দিয়েছিল সে তো আজ বুঝেছি। বইমেলায় দেখা করা কবিতা কম্যুনিটির বন্ধুরা। অং বং চং এর পিকনিক। শুদ্ধদার বাড়িতে খাওয়া দাওয়া। আমাদের কুট সাহিত্য। আহা, আমাদের ছোট কবিতার কাগজের প্রকাশ অনুষ্ঠান। ফটোগ্রাফি আর পেইন্টিং এর পার্থক্য শেখানো অর্কুট।এর মধ্যে খিল্লি শব্দটাও উঠে এলো আমাদের জিভে।

সাব্লাইম এক রকম প্রেম । যা নিয়ে নিজের ভিতরে নিজে কতদিন বুঁদ হয়ে থেকেছি নেশাড়ুর মত। সেই প্রেম লিখতে শেখালো। খরধার রসনায় অন্যের লেখা ছিঁড়তে বাঁধা দিলো। একা থাকার দিনগুলোয়  একাকীত্ব আড়াল করে দাঁড়ালো অর্কুট।

অজস্র সম্পর্ক দিলো অর্কুট। যাদের আজকাল খুব স্বাভাবিক আত্মীয়তা বলে মনে হয়।খুব দরকারে নির্ভর করতে পারি।রাজা দা আজ বলছিলেন সেরকম বন্ধুত্ব আজ আর হয় না। আমিও মানি এই ফেসবুক যেন কসমোপলিটান  ফ্ল্যাটবাড়িগুলোর মত। মুখ চেনাচিনি আছে, দেঁতো হাসি আছে কিন্তু আত্মাটুকু নেই। যা ছিল আমাদের অর্কুটে।

  

বহুদিন যাইনি ওখানে। ভাবতাম ওটা তো থাকবেই আমাদের প্রাগৈতিহাসিক ভালোবাসাবাসি, বন্ধুত্ব, শত্রুতা নিয়ে। কখনো মনে হয়নি এভাবেই একদিন ডুবন্ত জাহাজ হয়ে যেতে পারে আমাদের সেই কাল। যেন আমাদের পায়ের ছাপ ফেলে আসা ইস্কুলের করিডোর।ছেড়ে আসার পর যাওয়া হয়নি আর , কিন্তু আমাদের হাতের লেখা দেওয়ালে রয়ে গ্যাছে। কেউ নেই, আসাযাওয়ার অভিজ্ঞান রয়ে গ্যাছে শুধু। ঠিক যেভাবে আর দেখা হয়নি "মোর বীণা ওঠে কোন সুরে বাজি" র সঙ্গে সমে ধা ফেলে পারমিতার নাচ, সোহিনীর গান। লাইব্রেরীর বইদের। বা যেমন মনে হয়েছিলো প্রথম প্রেম ভেঙে যাবার পর, সেই দুবছরের ভালোবাসা সত্যি হয়ে থাকবে আজীবন।

"আজীবন" শব্দটা বড্ড বড়। কালকে মেইলবক্সে আসা মেইলে অর্কুট কর্তৃপক্ষ লিখেছেন অনিবার্য কারণ বশতঃ তারা অর্কুট বন্ধ করে দিচ্ছেন।অন্য নেটোয়ার্কিং সাইটে যেন আমরা ফুলে ফলে ভরে উঠি। এই শেষ বেলায় আমার দেওয়ালে পুরোনো চিরকুটের ছড়াছড়ি। কত ভালোবাসা, রাগ,দুঃখ... এরা আমাকে ছেড়ে চলে যাবে।বাসা বদলের আগে বড্ড দেখতে ইচ্ছে করছিল পুরনো সেই হাল্কা নীল ব্যাকগ্রাউন্ড। পুরনো সব প্রোফাইল পিকচার। বন্ধুর তোলা ছবিতে লেখা "আর চাঁদ তখন মরে যাচ্ছিলো একটা সম্পর্কের জন্যে"...

সত্যি তো, এ ভালোবাসায় আমার আর কি অধিকার? আমি তো এদের কোনো খবরই রাখিনি... একদিনও ফিরে এসে বলা হয় নি-

"চুলের কাঁটার বাঁকে বাঁকে
লেখা আছে গতিনির্দেশ
পাইনের স্কার্টের ঘেরে লেগে আছে কালকের শীত

জ্বরের নরম গন্ধ, বন্ধুর গাড়ির ব্যাকসীট...

কুয়াশায় মুছে গেছে অর্ধেক গ্রাম
হেডলাইটের ধার মিশছে নরম অন্ত্যমিলে

অতীত, কেমন আছ?
এতদিন কীরকম ছিলে?"
               
( উপরের কবিতাটি ব্যবহার করতে দিয়ে ঋণী করলেন আশিক খুদাবখ্‌স । ইনিও যথারীতি অর্কুটে পাওয়া বন্ধু।) #bidayorkut

No comments:

Post a Comment