Monday, July 28, 2014

রেলরোডার্স ল্যামেন্ট

September 9,2013



(১) “আমাদের মফঃস্বল শহরটার উপর থেকে কোনো এক্সপ্রেস ট্রেন যায় না।”

এইটুকু লিখবার পর আমি দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ি। কলম চলতে চায় না আর।সত্যিই তো কি বা লেখার আছে?কি আছে এই শহরে? দুধারে পুরনো বাড়ির দল,রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছে। সকালে রেডিও বেজে ওঠে। “মানে না নয়ন কেন, ফিরে ফিরে চায়”।

শীতলাতলার বড় অশত্থ গাছটায় ছিটকে পড়ে সকালের রোদ। এবড়োখেবড়ো রাস্তায় ঘন্টি বাজিয়ে চলে যায় দুধ-ওয়ালা। মুদির দোকানে জটলা হয়। টাইমের কলে দাঁত মাজা,চান করা লোকেদের ভিড়। ঘোষালবাড়ির দরজার মাথায় গনেশের সামনে দুটো জবাফুল রাখা।   রমণীবাবু গলা খাকড়িয়ে রকে বসে আনন্দবাজার পড়েন।  নতুন কোন গল্প নেই, আছে শুধু বিষাদ যাপন,যেমনটি বিষণ্ণ আমাদের রেল-ইস্টিশন।

(২) রোজ রোজ নতুন কিছু ঘটে না বলে বোধহয় আমাদের ষ্টেশনটাও বড় সাদা-মাটা। মফঃস্বলী  ধুলোটেপনা নিয়ে পড়ে আছে। একটা দুটো কদমগাছ, সিমেন্টের বাঁধানো বসার জায়গা,নোংরা থাবায় কান-চুলকানো নেড়ির ছানা,ধোঁয়া ওঠা চায়ের দোকান, ফুলওয়ালী মাসিরা।কি ভীষণ ঘরোয়া, কি ভীষণ মন খারাপ,যখন রোজ আমি এই ষ্টেশনটা ছেড়ে যাই আটটা বাইশের লোকালে। অনিবার্য কবিতা মনে পড়ে। “সেকি জানিত না যত বড় রাজধানী, তত বিখ্যাত নয় এ হৃদয়পুর”।

আমাদের ষ্টেশনটার নাম হৃদয়পুর। এ আশ্চর্য নাম, সমস্ত ভালবাসা নিয়ে ছলকে ওঠে। তবু কোনো এক্সপ্রেস ট্রেন আমাদের ষ্টেশনটার উপর দিয়ে যায় না। ট্রেনগুলো জানতেই পারে না একগাদা মায়া নিয়ে কৃষ্ণচূড়া গাছের তলায় দূরপাল্লার গাড়ির জন্যে অপেক্ষা করে আছে একটা আশ্চর্য ষ্টেশন।

(৩) আকাশটা এখন দেখলে স্পষ্ট বোঝা যায়,পুজো আসছে। গত কদিন যে কি বৃষ্টি ,কি বৃষ্টি গেলো। ট্রেনের দরজায় দাঁড়িয়ে আমি দিব্যি বুঝে যাচ্ছিলাম নিস্তব্ধ জলস্রোতে কি ভাবে ভরে উঠছে মাঠ ঘাট নয়ানজুলি। আকাশে মন্থরগামী জলভারাবনত মেঘ।যার ফাঁকে উকি দেয় গাঢ় নীল, শারদীয় পূর্বাভাস। বামনগাছি ষ্টেশনটা আসার আগেই আমি উঠে গিয়ে উল্টো দিকের দরজায় দাঁড়াই, হু হু হাওয়া এসে লাগে চোখে মুখে।আমি দেখি লকলকে লাউ-লতাওয়ালা লাইনের ধারের ঘর ছাপিয়ে জল বয়ে যাচ্ছে ট্রেনের সমান্তরালে। শিরশিরে হয়ে উঠছে জলি ধানের শীষ, আরো জমাট বাঁধছে দীঘল পাট গাছেরা, কেঁপে উঠছে শামখোল আর সারসের ডানায়।

লাইনের পাশে নয়ানজুলিতে শাপলা কুঁড়ি এসেছে। ঠিক তখনই বাদুলে হাওয়ায় দেবীপুর সঙ্ঘশ্রীর পলিথিনের পর্দা উড়ে যায়, বিষণ্ণ দাঁড়িয়ে থাকে দেবীর সংসার, পুত্র-কন্যা সহ। এক মেটে। যেন অন্নহীন বস্ত্রহীন বানভাসি মা।

(৪)  
ট্রেনের সঙ্গে চলতে থাকে চিত্রাবলী। একি রকম ঝম্‌ঝম্‌ শব্দে স্মৃতিরাও ছুটে আসে।ছেলেবেলা পেরিয়ে আসে হাওয়া, রোদ আর মেঘের সরগম। পুরনো স্মৃতি মানে সতত শীতকাল। হাড়মজ্জা কেঁপে ওঠে দিনগুলো চলে গ্যাছে বলে। ফিকে হয়ে যায় আসন্ন উৎসব ও পূজাবার্ষিকীর রঙবাহার। মনে পড়ে চলে যাওয়া দিব্য দিনরাশি। ঘাসে শুয়ে থাকা লেবু রঙা রোদ,গার্লস স্কুল। কি ভীষণ অপেক্ষা আর সাধনায় পাওয়া পুজোবার্ষিকী। যেন প্রবাস থেকে ফিরে এল প্রিয়জনেরা। সাইকেল রাখার জায়গাটায় কাকাবাবু আর সন্তু নতুন রোমাঞ্চের অপেক্ষায়। অরণ্যদেব সোনাবেলার তটভূমিতে একলা দাঁড়িয়ে থাকেন। স্কুল-ব্যাগে লুকিয়ে থাকে পঞ্চ-পাণ্ডব আর পঞ্চু কুকুর। অর্জুন তো ইস্কুলের পথে হেঁটে যায়। আর আমি ওদিকে পেরিয়ে যাই শালবনের ছায়ায় ঘুমন্ত হাঁসের দল, বাড়ির দিকে ছুট লাগানো শামলা কানের ধলা কুকুর। এভাবে এসব গল্পের কোন শেষই আমার দেখা হয় না। নির্দিষ্ট গন্তব্য এলে আমি নেমে পড়ি অস্তিত্বের দিকে। ছেলেবেলা হারিয়ে যাওয়া বাচ্চার মত অযত্নে পড়ে থাকে ট্রেনের কামরায়।   

(৫) সন্ধ্যের ট্রেনে আজকাল প্রায়ই দেখি লাল-কালো ফুল ছাপ জামা পরা একটা মেয়ে কোলে একটা না-খেতে পাওয়া বাচ্চা নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। কোনো ষ্টেশন এলেই উদগ্র আগ্রহে গলা বাড়িয়ে কি যেন খোঁজে । নিত্যযাত্রী হাওয়া-বিলাসিনীরা গাল দেন। সরে বসতে পারো না?একটু দরজার ধারে দাঁড়াবার উপায় নেই। মেয়েটি শুধু কেঁদে চলে ষ্টেশনের দিকে তাকিয়ে।

ওর লাইনের ধারের ঘর থেকে ছ’বছরের বাচ্চাটি বেরিয়ে গিয়ে আর ফেরেনি। মা তাই খুঁজতে বেড়িয়েছে। আহা, ও ট্রেন দেখতে বড়ো ভালোবাসতো। কি জানি কোন ষ্টেশনে ট্রেন দেখতে গিয়ে আর ঘরে ফেরার কথা মনে নেই। মা তাই খুঁজে যায়, রোজ রোজ। প্রতিদিন। হু হু হাওয়ার সাথে ছেলে হারানো মায়ের উৎকন্ঠা ঘিরে ধরে আমায়। মনে পড়ে অনেক দিন আগে সায়নী নামের একটা ছোট্ট মেয়ে তার খাতার পিছনে লিখে রেখেছিল “not a shirt on my back, not a penny to my name Lord  I can’t go a- home, this a way, this a way”...  তারপর কি হয়েছিলো সেই মেয়েটার,আমার আর মনে পড়ে না।তাই বাকিটুকু আমি গাইতে থাকি হাওয়ায়।যে হাওয়া নাকি অতীতের।যে হাওয়া সর্বত্র বয়ে যাচ্ছে আকাশের নীচে।
“lord I m one lord I m two lord I m three lord I m four lord I m five hundred miles form my home”.... ঘরে ফেরার পথ কি সুদূর।সাগর-পাহাড়-জ্যোছ্‌না ডিঙিয়ে যখন ষ্টেশনে এসে নামি,দেখি আমার পিছু পিছু এসেছে ঘর-পালানোর যাবার লোভ।

(৬)

জংশন ষ্টেশনটায় একেকদিন সন্ধ্যের সময় দাঁড়িয়ে ট্রেন দেখি, ঠাকুরনগর লোকাল, হাসনাবাদ বারোবগি, প্রিন্সেপ-ঘাট সার্কুলার । একটা লোক পায়েসের গন্ধওলা গাছ বিক্কিরি করে। আলোজ্বলা চায়না লাটিম। কাগজের টিয়ার ঝাঁক। বার্মা কলোনির বাড়ি থেকে যাকে এখানে ফেলে গ্যাছে,সেই দিদিমা রোজ এই সময় গুনগুনিয়ে কাঁদে।আর নৈমিত্তিক সঙেদের এই বোম্বাচাকে হঠাৎ চোখে পড়ে যায় পাগল আর ভিখারিনীর সংসার।
ছেঁড়া ফ্লেক্সের টুকরো দিয়ে তৈরি আচ্ছাদন। সুগৃহিণীর নৈপুণ্যে ভিখারিনী ভাঙা থালায় বেড়ে দেয় আস্তাকুঁড় ঘেটে আনা খাবারের শেষ, দোকানীদের দান।আগ্রহে থালাটাকে আঁকড়ে ধরে পাগল। খেতে থাকে নিবিড় মনযোগে।

ছোটবেলায় আমরা সব্বাই ভাবতাম শারুকের সঙ্গে কাজলকে হেব্বি মানায়। কিন্তু ওদের কোনদিন বিয়ে হবেনা। কারণ কাজলের ভালবাসা অজয় দেবগণের সাথে। আমাদের কিছু মফস্বঃলী দুঃখ হত তখন। অপ্রাপণীয়কে রিজেকশনের দুঃখ। সেই দুঃখ আজকাল ভারী হয়ে আসে সন্ধ্যের ষ্টেশনে। তার কিছু সঙ্গে করে আনি। ঘরে ফিরে কম্পুটারে একলা শহরে একলা মেয়েকে নিয়ে খেলতে থাকি রাত। আর ষ্টেশনে সি.পি.আই.এম.এলের প্রকাশ্য সম্মেলনের দেওয়াল লিখনে পিঠ দিয়ে বসে থাকে পাগল ও ভিখারিনী। পাগলের সামনে ভাতের থালা,দুর্বোধ্য ভাষায় আদর।ভিখারিনী হাতে ধরে রেখেছে অস্ত্র আঁকা লালপতাকা,তারও চোখে দুস্পাঠ্য দাবী। কে জানে, একে হয়ত ভালোবাসা বলে। কিংবা বিপ্লব, যা জমে উঠে একদিন বিস্ফোরণ হবে।

(৭)
‘দিদিভাই, আমার প্রেশার আর সুগার, তোমরা পয়সা দিলে তবে ওষুধ কিনবো”।

এমত বলে অশ্রুকণা দত্ত , উঠে আসেন ডাউন হাসনাবাদ লোকালে।হাই পাওয়ার চশমা চোখে, পরনে মিলের শাড়ি ।হাতে থলি, রঙচটা ছেঁড়া কালো ব্লাউজ। সীটের কোণা ধরে ধাতস্থ হন তিনি। তারপর হাত মুঠো করে বলতে থাকেন “বল বীর,চির উন্নত মম শির”।

একের পর এক রবি ঠাকুর, সুকান্ত,শক্তি চট্টোপাধ্যায় হয়ে  জয় গোস্বামীতে শেষ হয় ভ্রমণ। আমরা কেউ বলি দিদা বীরপুরুষটা বল না,কেউ বলি অবনী বাড়ি আছো। সব কবিতার শেষে দিদা আমাদের বলেন “তোমরা পয়সা দিলে তবে ওষুধ কিনবো”।

অপদার্থ স্বামীটি মরে গিয়ে বাঁচিয়েছেন,মেয়েকে রোজ দুবেলা জামাই মেরে ধামসে দেয়। আমাদের ট্রেনতুতো অশ্রুকণা দিদা  সারা জীবন চোখের জলের চাষ করেছেন।বৃথা গ্যাছে বেথুন স্কুলে পড়া। মেয়ে জন্ম যে কত ছার বুঝে গ্যাছেন তিনি। তবু মেয়ে কামরার ভিড়ে কালশিটে, চোখের জল, মেয়ে বলে নিত্য অপমানের সব দাগ লুকিয়ে শুনতে পায় দূরাগত কণ্ঠস্বরে বৃদ্ধা কেমন বলে চলেন- “নিজেরে আজ কহ যে, ভালো মন্দ যাহাই আসুক, সত্য রে লও সহজে”।



(৮)
ঝমঝম শব্দে সরু খালটা পেরোলেই মনে হয় যেন নদী পেরোচ্ছি। দরজায় দাঁড়িয়ে দেখতে পাই অনেক নীচে ঘোলা জল বয়ে যাচ্ছে । দু-একটা কচুরিপানার ঝাঁক। পায়ে হাঁটা ব্রিজের থামে আটকে থাকে গত বছরের বিসর্জনের খড়কুটো। ব্রিজের উপরে সাইকেল হাতে মগ্ন থাকে কিশোর-কিশোরী। দূরে একটা ডিঙি নৌকো, শূন্য।একা একা ভেসে এসে আটকে আছে কেশর পানার দামে। আকাশে হঠাৎ মেঘ করে আসে।দিগন্তে যেখানে বাঁক নিয়েছে নোয়াই খাল,সেখানে ঘন হয়ে আসে ছায়া,ধুলিয়া মল্লারের মত। বহুদূর অবধি এই খালটা এসেছে রেল লাইনের সাথে সাথে। উঁচু লাইনের ঢাল খাড়া নেমে গ্যাছে। তার ধারে ধারে কদমের বন। বর্ষার শুরুতে দেখেছি ছোট্ট ছোট্ট বলের মত সবুজ রঙের ফুলের কুঁড়ি। আর এখন বর্ষার শেষে পুটুস ঝোপে কিছু কিছু হলদে গোলাপী ফুল টিকে আছে। নীচে ,অনেক নীচে খাল এখন জল টইটুম্বুর। ধারে ধারে গ্রানাইটের বড় বড় শিলা। মেঘ কেটে রোদ পড়লে সোনা হয়ে যায় জল। একটা পাগলা-খ্যাঁচা লোক সারা দুপুর কোঁচ হাতে পাথরে পাথরে মাছ ধরে বেড়ায়।আশে পাশে দুয়েকটা বাঁশের খুঁটিতে মাছরাঙাও এসে বসে শিকারের আশায়,পাথরে পাথরে লাফিয়ে যায় চঞ্চল ছাতারে।  মনেই হয় না একটা গোটা শহরের বর্জ্য, ময়লা জল সারা বছর একা একা বয়ে নিয়ে যায় এই খালটা। রোদ পড়ে আসা শেষ বর্ষার বিকেলে এই গিটার শহরের ও একমাত্র “নদী” ।

(৯)
আমাদের শহরের একমাত্র শিল্প গিটার। ঘরের উঠোনে উঠোনে শুকায় কাঠামো। কোথাও বেজে ওঠে সূক্ষ্ম তারের রণন। কিন্তু দিনের আলোয় দেখি আস্তে আস্তে বদলে যাচ্ছে এই মফঃস্বল ।হয়ে উঠছে প্রগাঢ় শহর। শপিং মল,সিনেপ্লেক্স,বার আর ডিস্কো থেক। সস্তায় কফিপানের আড্ডা।আপনার হৃদয় তৃপ্ত করবে গহনা এমন। “ডোন্ট রিড ইট, জাস্ট ইট ইট” আইসক্রিম শপ ।                      
                   রাস্তা চওড়া হচ্ছে তাই কাটা পড়ছে এই মফঃস্বলের গর্ব যত কৃষ্ণচূড়া গাছ।ডাকবাংলো মোড়ের কাছে একটা নীল রঙা পুরোনো বাড়িতে এক ভদ্রলোক থাকতেন। কিঞ্চিৎ ক্ষ্যাপা। রাস্তার লোক পেলেই ধরে শোনাতেন স্ব-আবিষ্কৃত কৃষ্ণতত্ত্ব। কাল সেখানে দেখলাম বাড়িটা ভেঙে তানিশ্‌কের আলিসান বিপণি উঠেছে ।এখন এই ক্রমবর্ধমান শহরের ভিড়ে সেই পাগল মানুষটিকে কি ভাবে খুঁজে পাবো? কি ভাবে খুঁজে পাবো প্রখর রোদে ঝিলমিল ছায়া ?

                     বিকেলের আলো পড়ে এলে আধ-খানা নতুন আর আধ-খানা পুরনো শহর হেসে ওঠে।রাস্তায় ল্যাম্পপোস্টে ময়লাটে আলো জ্বলে। ষ্টেশনে ভিড় আপ ট্রেন থামে। শান্‌দার এই শহরে এলে আজকাল আমার মনে হয় এ যেন অচেনা জনপদ, জানা নেই শোনা নেই হঠাৎ করে হারিয়ে গেছি যেন। তবু রাত্রি হলে রাস্তার মোড়ে এসে বসে গাইঘাটার মাসি, ডেকচির আড়াল থেকে খদ্দেরের হাতে তুলে দেয় নিষিদ্ধ সুধার প্যাকেট। পাথরে ঠোক্কর দিয়ে মাতাল বাড়ি ফেলে। সামনের রাস্তায় কে যেনো মাউথ অর্গানে বাজিয়ে যায়- “if you miss the train  I m on you will know that I have gone, you can hear the whistle blow, a hundred miles.”
তুমি তো জান আমি চলে গেছি,তুমি তো জানো মফস্বঃল।


(১০)
    “আদম সুমারী ক্লান্ত নিরুত্তাপ রাতের হোটেলে     সব চাবি ঘরে আসে প্যাকেটে প্যাকেটে তাস কিংবা ত্রিকোণ     থাকে শুধু অন্ধকার ,মুখোমুখি বসিবার ব্যর্থ আয়োজন”।

 ক্লান্ত রাতের ট্রেন কারশেডে ফিরে যায়।সেই ট্রেনে ঝুলতে ঝুলতে চলে যায় উলি-ঝুলি পাগল। সস্তায় জ্বেন তাড়াইবার উপায়। স্ত্রীকে বশীকরণ। সুলভে সিরিয়ালে অভিনয়। গোপনে মদ ছাড়াচ্ছে কল্যানীর মানব ফাউন্ডেশন। এর ঠিক কোল ঘেঁষে দেওয়ালে লেখা থাকে উত্তপ্ত হৃদয়ের পাশে, রাজু লাভস্‌ সোনু।এরম সব বিচিত্র ঘৃণা-ভালবাসার কথা নিয়ে, আশ্চর্য সব বিজ্ঞাপন বুকে নিয়ে রাতের ট্রেনগুলো ঘুমোতে যায়।

যীশু বলে গ্যাছেন, তিনি খুঁজে পেয়েছেন মেষেদের প্রকৃত চারণভূমি। আমাদের হলুদ-সবুজ চেককাটা চাদরে দিদির মেয়ে এঁকে রেখে গ্যাছে  স্কুলের ব্যাগ কাঁধে দু-বিনুনি বাচ্চা মেয়ে, ঘুড়ি হাতে একলা ছেলে। বাবা রোজ রাতে ক্লান্ত হয়ে সেই বাচ্চা মেয়েটার পাশে শুয়ে মাথায় হাত রাখেন,ফিস্‌ফিস করে ডাকেন “দিদিভাই”।

 খস্‌খস্‌ শব্দে বাঁশপাতা ঝরে পড়ে। কচুপাতায়, পেয়ারাপাতায় শিশির জমে ঘুমহীন। বুনোফুলের গন্ধ, ওষধি গন্ধ ভারী হয়ে ওঠে।
এই ভাবে দিব্য এক রাত নামে আমাদের মফঃস্বলে। পেঁচাদের ডাকে সেই রাত গাঢ় হয়, একেকটা রাত্রিকালীন শীত পেরিয়ে চলে যায় আরেকটা ভোর, আরেকটা জীবন্ত বিষাদের দিকে।


( ব্যবহৃত কবিতাগুলি রবি ঠাকুর , শক্তি চট্টপাধ্যায়, অচ্যুত মণ্ডল ও the journeymen এর ।)    

No comments:

Post a Comment